কাব্যপ্রেমিক
মোঃ হাসান শাহরিয়ার
কবির ভাইয়ের কাব্যপ্রীতির কথা কারো অজানা নয়। সেদিন কোচিংয়ে যাচ্ছি, আমাকে ডেকে বললেন, “নতুন একটা পরমাণুকাব্য লিখেছি, শুনবা?”
আমি বললাম, “পরমাণুকাব্যটা আবার কি জিনিস?”
কবির ভাই বললেন, “দেখ না, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অনুকাব্য ছাপা হয়। ছোট ছোট চার লাইনের কবিতা। যেমন ধর-
“শাহরিয়ার তোমার
কালো চুল,
খোপা খুলে
করোনা ভুল।”
আমি বললাম, “কবির ভাই, আমার মাথা তো টাক। চুল-ই তো নাই। খোপা পাইলেন কোথায়?”
“আরে ধুর। ওটা ছন্দ মিলাবার জন্য বলেছি। যেটা বলছিলাম, অনুকাব্য হয় চার লাইনের। লেটেস্ট ভার্সন পরমাণুকাব্য। এটা হল দুই লাইন।”
“দুই লাইনে কি কবিতা?”
“এটাই তো আমার প্রতিভা। আমার নতুন পরমাণুকাব্যটা শোনো-
চুন খাইতে লাগে পান,
দৌড়ে গিয়ে কিনে আন।”
“অসাধারণ, কবির ভাই। দারুন হইছে। কিন্তু আমার এখন পান কেনার সময় নাই, কোচিংয়ের দেরি হয়ে যাবে।”
“আহা! এই জন্যেইতো তোমাদের এই দশা হইতেছে। খালি কোচিং কোচিং কর। নিজে নিজে পড়বা। আমার আরেকটা পরমাণুকাব্য আছে-
নিজের পড়া নিজে পড়,
না পারলে কানে ধর।”
“কবির ভাই, আপনার পরমাণুকাব্যে একটা সমস্যা আছে। এই দুই লাইন ভেঙ্গে চার লাইনের অণুকাব্য বানানো যাবে। যেমন-
নিজের পড়া
নিজে পড়,
না পারলে
কানে ধর।
কিন্তু সায়েন্স বলে, পরমাণু ভাঙলে পাওয়া যাবে ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন। আপনার এখানে উল্টো হয়ে গেছে।”
কবির ভাই বললেন, “তাইতো! এটা খেয়াল করি নাই। পরমাণুকাব্য ভাঙলে পাওয়া যাচ্ছে অণুকাব্য! আসলে আমি তো সায়েন্স-এর ছাত্র না। বুঝলা না?”
আমি বললাম, “আপনি বরং নিউক্লিয়াসকাব্য লেখেন। এটা হবে এক লাইনের।”
কবির ভাই মাথা নেড়ে বললেন, “এক লাইনে ছন্দ মেলানো যাবে না। ছন্দ মেলানোটা হইতেছে মেইন।”
“তাহলে কোয়ার্ক কাব্য লেখেন। এটাতে লাইন-ই থাকবে না। দুই শব্দেই কবিতা শেষ। দুই শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকবে অনেক অন্তর্নিহিত অর্থ। যার যা বোঝার, সে তা বুঝে নিবে।”
“খালি বললে তো হবে না। উদাহরণ দাও।”
“যেমন ধরেন-
কবির
বধির।”
এরপর কি ঘটল তা বলাই বাহুল্য। যার বোঝার সে বুঝে নিন।
সপ্তাহখানেক পর এক বিকেলে হাঁটতে বের হয়েছি। দেখি, কবির ভাই এক টঙ দোকানে বসে বিমর্ষমুখে রঙ চা খাচ্ছেন। আমি আলাপের ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলাম। “ভাই, গতরাত্রে একটা টয়লেটকাব্য লিখেছি।”
কবির ভাই ভুরু কুঁচকে বললেন, “ফাজলামি করবা না।”
আমি বললাম, “ফাজলামি না। কাব্যটা টয়লেটে বসে পেয়েছি তো, তাই নাম টয়লেটকাব্য। টয়লেট হল জগতের সবচেয়ে বড় চিন্তাগার। এখানেই যত মহৎ কর্মের সূচনা।”
“চুপ কর।”
“টয়লেটকাব্যটা আগে শুনেন-
ধানশালিকের পাখা যেন
আমার মনের আগুন,
বসন্ত চলিয়া গেল
আসিল ফাগুন।”
কবির ভাই বিরক্ত মুখে বললেন, “কি সব যা তা লিখছ। বসন্ত চলে গেলে ফাগুন আসে কিভাবে?”
“ভাই, ওইটা ছন্দ মিলাবার জন্য লিখছি। কিন্তু আপনি এমন মনমরা কেন? কি হইছে?”
“আর বোলোনা, সে এক বিরাট হিস্ট্রি। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ।”
আমি বললাম, “বিরাট হিস্ট্রি সংক্ষেপ করিয়া বলেন।”
কবির ভাই আগের মতো বিরসমুখে বসে থাকলেন।
আমি আবার বললাম, “কি হইলো, বলেন না কেন? বলেন।”
কবির ভাই বললেন, “গতরাত্রে তোমার ভাবিকে একটা প্রেমপূর্ণ কাব্য শুনিয়েছি। সেটা শুনে সে রাগ করছে। কথা বলে না। রান্না-বান্না করে না। ঘরে বইসা স্টারপ্লাসে কি সব সিরিয়াল দেখে। সকালে-
দুপুরে হোটেলে খাইছি। বদহজম হইছে। পেট গুড়গুড় করতেছে।”
“এই অবস্থায় আপনি চা খাচ্ছেন কেন? অবস্থা তো আরো খারাপ হবে।”
“আর কইয়ো না। মাথা-টাথা খারাপ হয়ে গেছে।”
“কী কাব্য শুনাবার পর আপনার এই অবস্থা? আমাকে শুনানতো।”
“গতরাত্রে তোমার ভাবি চোখে কাজল নিছে। আমি বললাম-
কী সুন্দর তোমার ঐ
কাজল কালো চোখ,
কোত্থেকে উড়ে এসে
ঢুকল একটা পোক।”
“এইটুকুই...?”
“আর সামান্য আছে। সে রান্না ঘরে যাচ্ছে, আমি বললাম-
ভীষণ ভালো তোমার,
রান্না করার হাত,
সবচাইতে লাগে ভালো
পান্তা বাসি ভাত।”
“করছেন কি! এই কথা বলতে গেলেন কেন?”
“বুঝতে পারি নাই। ছন্দ মিলাবার জন্য বলেছি। বইলাই বুঝছি বিরাট মিসটেক হইছে। আমার কপাল মন্দ। ছন্দ মিললেও অর্থ আউলা হয়ে গেছে।”
আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম। তার আগেই কবির ভাই মুখ বিকৃত করে পেট চেপে বাসার দিকে ছুটলেন। কে জানে, হয়ত নতুন কোন টয়লেটকাব্য অথবা টিস্যুপেপার কাব্যের আগমন ঘটতে চলেছে।
---------------------------